হাত পা ঘামছে আপনার? বাংলাদেশের প্রযুক্তিতে আছে সুন্দর সমাধান

অতিরিক্ত হাত পা ঘামা প্রতিরোধক যন্ত্র

ডঃ খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী
অনারারী প্রফেসর, বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অতিরিক্ত হাত-পা ঘামা একটি বিব্রতকর এবং অস্বস্তিকর শারীরিক সমস্যা। হাতের বা পায়ের তালু ছাড়া শরীরের অন্যান্য অংশেও অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে। মৃদু থেকে শুরু করে ফোঁটা-ফোঁটা পানির মত ঘাম পড়তে পারে এ সমস্যায়। বিভিন্ন কারণে অতিরিক্ত ঘাম হতে পারে যার কারণ পুরোপুরি জানা নেই বিজ্ঞানীদের। তাই সমস্যাটির বৈজ্ঞানিক নাম Idiopathic Hyperhidrosis (ইডিওপ্যাথিক হাইপারহাইড্রোসিস)। ‘ইডিয়ট’ বা বুদ্ধিহীনতার সাথে শব্দটির মিলের বিষয়টি লক্ষ্য করার মত। অতিরিক্ত ঘামের কয়েক রকমের সমাধান প্রচলিত রয়েছে, যদিও এর প্রতিটিরই সীমাবদ্ধতা আছে।

সমাধান-১। দৈনিক প্রায় ৬ থেকে ৮ ঘন্টা অ্যালুমিনিয়াম ক্লোরাইড হেক্সাহাইড্রেট নামে একরকমের মলম লাগিয়ে পলিথিন শীট বা এ ধরণের কোন পাতলা আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা। তবে হাতের তালুতে এরকমভাবে মলম লাগিয়ে ঢেকে রাখাটা একটু অবাস্তব হয়ে যায় বৈকি। তার পরও এর সফলতার হার তেমন বেশী নয়। অনেকেরই এতে কাজ হয় না।

সমাধান-২। মেরুদন্ডের কাছে endoscopic thoracic sympathectomy (ETS) নামে এক ধরণের অপারেশন করে স্নায়ুবিশেষের একটি অংশ কেটে ফেলা। এর ফলে হাতে ঘাম হবার স্নায়ুগুলো মস্তিস্ক থেকে সঙ্কেত না পাবার কারণে আর ঘাম তৈরী করে না। বোঝাই যাচ্ছে এটি একটি ব্যয়বহুল ও জটিল অপারেশন। একটু এদিক ওদিক হলেই গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শরীরের অংশবিশেষে অনুভুতির দুর্বলতা চলে আসতে পারে। আবার হাতের ঘাম বন্ধ হলেও অনেক সময় শরীরের অন্য স্থানে ঘাম বেড়ে যেতে দেখা যায়। আর এ অপারেশনটি করলে তা পরে আর ফেরানো যায় না। তাই উপরে উল্লেখ করা কোন ক্ষতি হয়ে গেলে তা নিয়ে সারা জীবন চলতে হবে। তাছাড়া পায়ের ঘামের জন্য এ অপারেশনটি তেমন সুবিধাজনক নয়। এ সব কারণের জন্য এ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয় নি।

সমাধান-৩। বোটক্স (Botox) ইনজেকশন। এ ইনজেকশনটি Botulinum Toxin নামে একটি মারাত্মক বিষ থেকে তৈরী যার এক মাইক্রোগ্রাম খেলে বা শ্বাস নিলে একজন মানুষ মারা যেতে পারে। এ বিষকে অনেক পাতলা করে বোটক্স ইনজেকশন তৈরী কর হয়। শরীরের স্নায়ুর সঙ্কেত আদান প্রদানের কাজকে অকেজো করে দেয় বোটক্স। অতিরিক্ত ঘাম প্রশমনের জন্য এক বারে হাতের বিভিন্ন স্থানে চামড়ার ভিতরে ১০/১৫টি ইনজেকশন দিতে হয়। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়। একবার ইনজেকশন দিলে ৩ থেকে ৯ মাসের জন্য ঘাম স্বাভাবিক হয়ে যায়, কিন্তু এ বিরতির পর আবার ইনজেকশন দিতে হবে। এমনি করে সারাজীবন ধরে ইনজেকশন নিতে হবে। এ ক্ষেত্রেও ইনজেকশনটি একটু এদিক ওদিক হয়ে স্নায়ু ও মাংসপেশীর সন্ধিস্থলে পড়ে গেলে হাত কিছুটা দুর্বল বা অবশ হয়ে পড়তে পারে। এর খরচও অনেক, তারপরও একটি ভয় থেকেই যায়। পাতলা করে নিলেও একটি বিষ সারা জীবন ধরে নিতে থাকলে তার দীর্ঘস্থায়ী পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া বা সাইড এফেক্ট কি হবে?

সমাধান-৪। আয়ন্টোফোরেসিস (Iontophoresis) যন্ত্র ব্যবহারে হাতের বা পায়ের তালুর ভিতর দিয়ে মৃদু একটি বিদ্যুৎ প্রবাহ পরিচালিত করা। ১৯৩০ এর দশকে প্রথম হাত-পা ঘাম নিরসনের জন্য আয়ন্টোফোরেসিস এর ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয় ও ধীরে ধীরে এ পদ্ধতির উন্নতি হয়। তবে এটিও স্থায়ী সমাধান নয়, একবার ভাল হবার পর ৫/৬ সপ্তাহ পরে আবার ঘাম শুরু হয়। তখন আবার এ চিকিৎসা নিয়ে আবারও ৫/৬ সপ্তাহ ভাল থাকতে পারেন। এ পদ্ধতির সুবিধা হল যে এর কোন পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া নেই এবং রোগী ঘরে বসেই এ চিকিৎসা নিতে পারেন। তাই কিছুদিন পরপর কয়েকদিন করে এ চিকিৎসা নিয়ে রোগী সবসময়ের জন্যই ভাল থাকতে পারবেন। তবে এ চিকিৎসার কার্যকরণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা এখনও পরিষ্কার নন। সব রোগীর ক্ষেত্রেও এ পদ্ধতি কাজ করে না। পাশ্চাত্যের বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে দেখা যায় যে প্রায় ৮৫% রোগীর ক্ষেত্রে এ পদ্ধতি কাজ করে, ১৫% ক্ষেত্রে কাজ করে না। তবে বাংলাদেশে আমরা এর থেকে অনেক ভাল ফলাফল পেয়েছি, কয়েক হাজার রোগীর প্রায় ৯৮% ই সুফল পেয়েছেন। উপরের চারটি সমাধান বিশ্লেষণ করে আমাদের ধারণা, আয়ন্টোফোরেসিসই হতে পারে অতিরিক্ত হাত-পা ঘামের সবচেয়ে ভাল সমাধান।

বাংলাদেশে আয়ন্টোফোরেসিস
১৯৯২ সনের দিকে দেশের একজন বিশিষ্ট চর্ম চিকিৎসক, ডঃ রেজা বিন জায়েদ আমাকে অনুরোধ করেন দেশে আয়ন্টোফোরেসিস যন্ত্র তৈরী করার জন্য। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক। বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে এ যন্ত্রের ভিতরের কোন বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছিল না। কেবলমাত্র কার্যকারণ সম্পর্কে যতটুকু ধারণা করা যায় তার উপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিন্তায় একটি যন্ত্র তৈরী করি। এ যন্ত্রটি নিয়ে ডঃ জায়েদ তৎকালীন পিজি হাসপাতাল (বর্তমানের বিএসএমএমইউ) এবং বারডেমে দু বছর ধরে রোগীদের উপর পরীক্ষা করে ভাল ফলাফল পান। এ সফলতার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৪ থেকে নিজের একটি কেন্দ্র থেকে রোগীদেরকে সামান্য কিছু অর্থের বিনিময়ে এ চিকিৎসা সেবা দেয়া শুরু করি। কেউ চাইলে যন্ত্র তৈরী করে দেয়ারও ব্যবস্থা করি। ঘাম প্রতিরোধ করে, তাই আমরা যন্ত্রটির নাম দেই Anti-Sweat (অ্যান্টি-সোয়েট)

পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হল। অনেকেই এসে শুধু দেখে যাচ্ছেন, কিন্তু কেউই চিকিৎসা নেয়া বা যন্ত্র নেয়াতে উৎসাহ দেখাচ্ছেন না। কারণ, চিকিৎসা পদ্ধতিটি মোটামুটি অপরিচিত, এমনকি অনেক ডাক্তারদের কাছেও। তখন দু’মাসের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়ার ঘোষণা দিয়ে বিজ্ঞাপন দিই। কিছুদিনে ২২ জন রোগী চিকিৎসা নেন, এবং সবাই ভাল হন। পরবর্তীতে তারা সবাই যন্ত্র কিনে নিয়ে যান। এভাবেই অল্প অল্প করে এ যন্ত্রের ব্যবহার চলতে থাকে দেশে। ২০০৮ সালে আমার নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োমেডিকেল ফিজিক্স এন্ড টেকনোলজি বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে এ বিভাগের গবেষণার আওতায় যন্ত্রটিকে এনে আরও উন্নত করা হয় এবং মাঝে মাঝে ঘোষিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বিনামূল্যে জনগণকে চিকিৎসা দেয়া হয়। তৃতীয় বিশ্বের সাধারণ মানুষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে এ বিভাগের উদ্ভাবন করা বা উন্নয়ন করা কোন যন্ত্রপাতিরই পেটেন্ট না করার একটি দর্শন আমাদের রয়েছে। ২০১৩ সন থেকে আমার নেতৃত্বে জনকল্যাণমূলক অংশীদারবিহীন কোম্পানী ‘বাইবিট লিঃ’ প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে এ কোম্পানীর মাধ্যমে সুলভে অ্যান্টি সোয়েট যন্ত্রটি জনগণের কাছে পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাইবিটের বিশেষত্ব হচ্ছে যে কোন ব্যক্তি বিশেষ এর মালিক নয়, এবং কেউই এর মুনাফার অংশ নিতে পারবে না। এ পর্যন্ত বাংলাদেশে কয়েক হাজার মানুষ অ্যান্টি-সোয়েট যন্ত্র ব্যবহার করে স্বাভাবিক জীবন যাপন করে যাচ্ছেন। ‘ভাই, তিরিশ বছরের জীবনে এই প্রথম একটি কাগজ হাতে নিয়ে চলতে পারছি’ – এ ধরণের প্রতিক্রিয়া আমরা পেয়েছি সুফল পাওয়া মানুষদের কাছ থেকে। অনেক রোগী আসত, হাত পা থেকে টপ টপ করে ঘাম পড়ছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই স্যান্ডেলের আশে পাশে কাদা কাদা হয়ে যাচ্ছে। তারাও ভাল হয়ে ধন্যবাদ জানাতে এসেছেন – কী যে ভাল লেগেছে।
আমাদের যন্ত্রে আমাদের পদ্ধতিতে দেয়া চিকিৎসায় কিন্তু পাশ্চাত্যের থেকেও বেশী সফলতার হার আমরা পেয়েছি, যেটি আগে লিখেছি। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে হাতের ঘাম স্বাভাবিক হলে পায়ের ঘাম এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আমাদের ব্যবস্থায় এক হাতে বিশ মিনিট করে দুহাতে চল্লিশ মিনিট করে দৈনিক চিকিৎসা নিতে হয়। প্রাথমিক চিকিৎসায় এরকমভাবে দশ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে বেশীরভাগ রোগীর ঘাম স্বাভাবিক হয়ে যায়। এরপর ৫/৬ সপ্তাহ পর আবার ঘাম শুরু হলেই দু তিন দিন একই পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিলে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। এমনি করে নিয়মিত ৫/৬ সপ্তাহ পর পর কয়েকদিন করে চিকিৎসা নিলে রোগী স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। এ সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে ওয়েবসাইটে।
এক হাতে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছি এ জন্য যে রোগী নিজেই অপর হাত দিয়ে বৈদ্যুতিক কারেন্টের নিয়ন্ত্রণ করে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পারেন। আবার সে হাতে একটি বই নিয়ে পড়ে সময়টি কাজে লাগাতে পারবেন। বিদেশী কিছু যন্ত্রে দু হাতে একসাথে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে সময় কম লাগে কিন্তু মাঝ পথে কখনও বৈদ্যুতিক কারেন্ট অসহনীয় হয়ে গেলে অপর একজনের সহায়তা ছাড়া নিজে কমাতে পারছেন না, কারণ হাত উঠিয়ে ফেললে একটু বৈদ্যুতিক শক পাওয়া যায়। অবশ্য এ শক ক্ষতিকর কিছু নয় তবে অস্বস্তিকর। আবার এ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক কারেন্ট শরীরের হৃদপিন্ডের মধ্য দিয়ে যায়, তাই পেসমেকার থাকা রোগীদের জন্য তাদের চিকিৎসা যন্ত্র ব্যবহার করা যায় না। অপরদিকে আমাদের ব্যবস্থায় এক হাতেরই এক অর্ধেক থেকে অপর অর্ধেকে বৈদ্যুতিক কারেন্ট চলে, ফলে হাতের বাইরে কারেন্ট যায় না। এর জন্য আমাদের যন্ত্রটি পেসমেকার থাকা রোগীর জন্যও নিরাপদ। তার উপর আমাদের যন্ত্রে ডিসি কনস্ট্যান্ট কারেন্ট ব্যবহার করা হয়, যার জন্য এটি আরও নিরাপদ। পাশ্চাত্যের অনেক যন্ত্রে পালসেটিং ডিসি কারেন্ট ব্যবহার করা হয়, যেটি হৃদপিন্ডের জন্য নিরাপদ নয়।

দেশের সাধারণ মানুষের অর্থে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত শাখায় উচ্চ শিক্ষিত হয়েছি। তার বিনিময়ে অল্প হলেও মানুষের জন্য কিছু করতে পেরেছি এটি আমাদের বড় পাওয়া।

Translate »